ঢাকা শনিবার, ৩০শে মে ২০২৬, ১৭ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


বাম্পার ফলনেও মুখে হাসি নেই কৃষকের: নীলফামারীতে ধানের দাম তলানিতে, লোকসানের শঙ্কা


প্রকাশিত:
১৭ মে ২০২৬ ১২:১৮

চলতি বোরো মৌসুমে নীলফামারীতে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। মাঠজুড়ে সোনালি ধানের শীষ দোল খাচ্ছে, চলছে ধান কাটার ব্যস্ততা। তবে এই বাম্পার ফলনেও কৃষকের মুখে স্বস্তির হাসি নেই। সার, সেচ ও শ্রমিকের মজুরিসহ উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় উল্টো লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। হতাশায় অনেক কৃষক আগামীতে ধানের পরিবর্তে অন্য লাভজনক ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছেন।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ধানের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। প্রতি বিঘায় ১৫ থেকে ২২ মণ পর্যন্ত ধান পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে বহুগুণ। শুধু সেচ বাবদই এক বিঘা জমিতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মাড়াই ও পরিবহন খরচ।

সদর উপজেলার কিসামত ভুটিয়ান এলাকার কৃষক আব্দুল জলিল আক্ষেপ করে বলেন, "দুই বিঘা জমিতে ধান চাষে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাজারে ধান বিক্রি করে পাওয়া যাবে বড়জোর ২৫ হাজার টাকা।" এই লোকসানের কারণে আগামীতে ধানের বদলে ভুট্টা চাষের পরিকল্পনা করছেন তিনি।

একই উপজেলার চওড়া বড়গাছা গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, "দেশে সব নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়লেও বাড়ে না কেবল কৃষিপণ্যের দাম। এবার আলু চাষেও লোকসান গুনতে হয়েছে। এখন ধানের বাজারও ভেঙে পড়ায় আমরা দিশেহারা।"

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা যায়, ধানের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। মীরগঞ্জ হাটে মাত্র এক সপ্তাহ আগেও প্রতি মণ হাইব্রিড ধান প্রায় ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে সেই একই ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায়। কৃষকদের অভিযোগ, এই দামে ধান বিক্রি করলে উৎপাদন খরচই উঠবে না। কিন্তু সংসারের দৈনন্দিন খরচ ও ঋণের চাপ সামলাতে বাধ্য হয়েই তারা পানির দরে ধান তুলে দিচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নীলফামারীতে ৮১ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এ বছর চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৯০১ মেট্রিক টন। ইতোমধ্যে জেলার প্রায় ১৫ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে বাজারে ধানের অতিরিক্ত সরবরাহ এবং সরকারি ক্রয় কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু না হওয়ায় ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে ধান কিনে নিচ্ছেন। ফলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

নীলফামারী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আতিক হাসান বলেন, "আবহাওয়া ভালো থাকায় এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম হওয়ায় এবার ফলন ভালো হয়েছে। আশা করছি চলতি মাসের মধ্যেই জেলার অধিকাংশ ধান কাটা শেষ হবে।"

নীলফামারী কৃষি বিপণন কর্মকর্তা উম্মে কুলসুম জানান, বাজারে ধানের সরবরাহ একযোগে বেড়ে যাওয়ায় দাম কিছুটা কমেছে। তবে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম শুরু হলে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তিনি কৃষকদের সরাসরি সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান বিক্রির জন্য উৎসাহিত করেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর রহমান বলেন, "সরকার নির্ধারিত দামে ধান সংগ্রহ শুরু হলে বাজারদর স্থিতিশীল হবে। এছাড়া কৃষকদের খরচ ও সময় বাঁচাতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৭৮টি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটার কাজ চলছে।"

কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবিলম্বে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ক্রমাগত লোকসানে কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারাবেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তায়। তাই দ্রুত সরকারি ক্রয় কার্যক্রম জোরদার করে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ এবং কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা।