যশোরে জমি নিয়ে বিরোধ: বড় ভাইকে পিটিয়ে জখম করলেন ছোট ভাই
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার কাশিপুর গ্রামে জমিজমা ও বাড়িতে প্রবেশের রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে বড় ভাইকে লাঠিসোটা দিয়ে মাথায় আঘাত করে গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠেছে ছোট ভাইয়ের বিরুদ্ধে। ঈদের পরদিন শুক্রবার সকালে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় আহত সায়েদ আলী (৬৫) বর্তমানে মনিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার কাশিপুর গ্রামের মৃত হাতেম আলীর ছেলে সায়েদ আলী ও তার ছোট ভাই আব্দুল্লাহ ওরফে ফড়িং (৪৮)-এর মধ্যে বাড়িতে প্রবেশের রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। বিষয়টি নিয়ে ঈদের আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা একাধিকবার বৈঠক করে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেন। খেদাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য খলিলুর রহমান, সমাজসেবক শওকত আলী, খুঁজিবার রহমান, আনিসুর রহমানসহ এলাকার বিশিষ্টজনেরা উভয় পক্ষকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। বৈঠকে উভয় পক্ষই শান্তিপূর্ণভাবে বিষয়টি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
কিন্তু ঈদের আনন্দের আবহ শেষ না হতেই সেই বিরোধ ফের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়।
আহতের ছেলে আব্দুল মান্নান অভিযোগ করে বলেন, “ঈদের পরদিন সকালে আমার চাচা আব্দুল্লাহ ওরফে ফড়িং, গোলাম রসুল ও চাচাতো ভাই শাওন হোসেন আমাদের বাড়িতে এসে আব্বার সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তারা উত্তেজিত হয়ে আব্বার ওপর হামলা চালায়। চাচা ফড়িং লাঠি দিয়ে আব্বার মাথায় সজোরে আঘাত করেন। সঙ্গে সঙ্গেই আব্বা মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। আমরা পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে মনিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসি। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আমার মনে হয়েছে, তারা পরিকল্পিতভাবেই আব্বার ক্ষতি করতে এসেছিল। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”
হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, মনিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তৃতীয় তলার ৩৭ নম্বর বেডে শুয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন সায়েদ আলী।
মনিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ অনুপ কুমার বসু বলেন, রোগী সায়েদ আলীর মাথায় আঘাতে জখম হয়েছে। তিনটি সেলাই দেওয়া হয়েছে। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ঈদের আনন্দমুখর পরিবেশে এমন ঘটনার শিকার হয়ে হতাশ ও আতঙ্কিত তার পরিবার।
খেদাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য খলিলুর রহমান বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমরা ঈদের আগেই দুই পক্ষকে নিয়ে বসেছিলাম। দীর্ঘ আলোচনার পর উভয় পরিবারকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে আনার চেষ্টা করেছি। সবাই তখন আমাদের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু পরে এমন ঘটনা ঘটায় আমরা অত্যন্ত ব্যথিত ও মর্মাহত। একটি পারিবারিক বিরোধ কখনোই সহিংসতার মাধ্যমে সমাধান হতে পারে না। আমরা চাই আইন অনুযায়ী বিষয়টির সুষ্ঠু নিষ্পত্তি হোক।”
এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি মিজানুর রহমান বলেন, “একই মায়ের গর্ভের দুই ভাইয়ের মধ্যে এমন রক্তাক্ত ঘটনা সত্যিই হৃদয়বিদারক। আমরা চেয়েছিলাম তারা আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুক। কিন্তু সামান্য একটি রাস্তার বিরোধ আজ একজন বৃদ্ধ মানুষকে হাসপাতালের বেডে নিয়ে গেছে। ঈদের সময় এমন ঘটনা পুরো এলাকাবাসীকে কষ্ট দিয়েছে। আমরা চাই সত্য উদঘাটন হোক এবং দোষীরা শাস্তির আওতায় আসুক।”
সমাজের প্রবীণ ব্যক্তি শওকত আলী বলেন, “মানুষের জীবনে জমি-জমা থাকবে, বিরোধও থাকতে পারে। কিন্তু ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি ও রক্তপাত কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। আমরা এলাকাবাসী হিসেবে চাই, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবার এমন বিভক্তির শিকার না হয়। পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় সবাইকে আরও সহনশীল হতে হবে।”
ঘটনার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘদিনের জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ ওরফে ফড়িং বা তার পরিবারের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে এলাকাবাসী নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।মনিরামপুর থানার ওসি মোহাম্মদ আবু সাঈদ বলেন, ঘটনাটি মৌখিকভাবে শুনেছি। লিখিত অভিযোগ পেলেই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
