ঢাকা রবিবার, ১২ই এপ্রিল ২০২৬, ৩০শে চৈত্র ১৪৩২


নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধ করায় ‘ষড়যন্ত্রের শিকার’ পিডিবিএফের সাবেক এমডি মাহমুদ হাসান!


প্রকাশিত:
১২ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫৯

 

নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য :

#পিডিবিএফে ১,৬৬৫ জনের নিয়োগ ও ১,০৫২ জনের পদোন্নতি নিয়ে সিন্ডিকেটের সঙ্গে দ্বন্দ্ব।

#কর্মকর্তার দাবি, নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধ করায় তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচার চলছে।

#সাবেক উপদেষ্টা শারমিন মুরশিদের দাবি, মাহমুদ হাসানের কর্মকাণ্ড ছিল ‘বিব্রতকর’।

#নতুন মন্ত্রীর চাহিদাপত্র (ডিও) সত্ত্বেও দুর্নীতির তদন্ত চলমান থাকায় জনপ্রশাসনের আপত্তি।

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে গিয়েই কি রোষানলের শিকার হয়েছেন ২২তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা ও যুগ্মসচিব মো. মাহমুদ হাসান? পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের (পিডিবিএফ) সাবেক এই ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) ঘিরে বর্তমানে জনপ্রশাসনে এমনই এক বিতর্ক ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

একাংশের দাবি, কর্মস্থলে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর অনৈতিক সুবিধা ও নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধ করায় তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক এক উপদেষ্টার বক্তব্য এবং কিছু গণমাধ্যমের খবর বলছে, তাঁর বিরুদ্ধে বিস্তর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

সিন্ডিকেটের রোষানল নাকি নিয়োগ দুর্নীতি?

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জর্জরিত পিডিবিএফের প্রধান নির্বাহী হিসেবে ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রেষণে দায়িত্ব পান মো. মাহমুদ হাসান।

তাঁর অনুসারী ও পক্ষের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি প্রতিষ্ঠানটিতে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নেন। অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ১ হাজার ৬৬৫ জন জনবল নিয়োগ এবং ১ হাজার ৫২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদোন্নতি দেন তিনি। এতে সিবিএ নামধারী একটি দুর্নীতিবাজ চক্রের অবৈধ নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষুব্ধ হয়ে ওই সিন্ডিকেট তাঁর বিরুদ্ধে বেনামি অভিযোগ দেয় এবং গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়।

তবে এই বিপুলসংখ্যক নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে গণমাধ্যমে ভিন্ন চিত্রও উঠে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, তড়িঘড়ি করে মাত্র দুই ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষা ও দ্রুততম সময়ে মৌখিক পরীক্ষা শেষ করে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়। এর পেছনে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন ও প্রভাবশালীদের সিন্ডিকেট জড়িত ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাবেক উপদেষ্টার অভিযোগ ও পাল্টা দাবি

যুগ্মসচিব মাহমুদ হাসান সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমিন মুরশিদের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। গত ১১ এপ্রিল (২০২৬) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শারমিন মুরশিদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, পিএস হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মাহমুদ হাসানের কর্মকাণ্ড ছিল ‘বিব্রতকর’।

সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, ‘তাকে দিয়ে সন্দেহজনক নথিতে সই করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল এবং তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও তার অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গা থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসায় এমন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাকে আমি পিএস হিসেবে রাখতে চাইনি।’

তবে মাহমুদ হাসান গণমাধ্যমের কাছে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তিনি পাল্টা দাবি করেছেন, পিডিবিএফে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়োগ বাণিজ্যে বাধা দেওয়ায় তিনি এ ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক ষড়যন্ত্র ও রোষানলের শিকার হয়েছেন।

পদায়ন নিয়ে টানাপোড়েন

চলমান এই দ্বন্দ্বের জেরে গত ১২ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি (২০২৬) তাঁকে পিডিবিএফ থেকে সরিয়ে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা) পদে বদলি করা হয়। মাহমুদ হাসানের দাবি, অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে তাঁকে এই বদলি করা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নবনিযুক্ত মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এই কর্মকর্তাকে নিজ মন্ত্রণালয়ে পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একটি আধা সরকারি পত্র (ডিও) পাঠান। সেখানে মাহমুদ হাসানের সততা ও যোগ্যতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এই পদায়নে আপত্তি জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির একাধিক অভিযোগের তদন্ত চলমান থাকায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এখনই তাঁকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করতে রাজি নয়।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা দেশের সিভিল সার্ভিসের বর্তমান চ্যালেঞ্জিং অবস্থাকেই তুলে ধরছে। সৎ ও পেশাদার কর্মকর্তারা যাতে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বানোয়াট অভিযোগের শিকার না হন, তার আইনি সুরক্ষা যেমন জরুরি; তেমনি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোরও দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনের মাধ্যমেই এই প্রশাসনিক বিতর্কের অবসান হওয়া সম্ভব।